জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে করণীয় - জমি ক্রয়ে যা অবশ্যই জানা উচিৎ
সজীব রহমান, ভূমি সহকারী কর্মকর্তা   Published: 2025-11-10 01:21:44
বাংলাদেশে জমি কেনা-বেচা একটি জটিল প্রক্রিয়া। আপনি যদি সতর্ক না হন তবে বড় আর্থিক ক্ষতি বা আইনি জটিলতায় পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই জমি ক্রয়ের পূর্বে নিচের বিষয়গুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করতে হবে।
জমির খতিয়ান (Khatiyan) যাচাই
আপনি যে জমিটি কিনবেন সেটির দাগ নম্বর ধরে তার মালিকানা যাচাই করেতে হবে। উক্ত দাগটি কোন খতিয়ানে রয়েছে সেই তথ্য জানতে আপনাকে CS, SA, RS, BS খতিয়ান সংগ্রহ করতে হবে এবং যদি নামজারি হয়ে থাকে তাহলে নামজারি খতিয়ান বা প্রস্তাবিত খতিয়ান সংগ্রহ করতে হবে।
- খতিয়ানের মাধ্যমে আপনি বুঝতে পারবেন জমির প্রকৃত মালিক কে।
- অনলাইন DLRS (https://land.gov.bd) থেকে খতিয়ান যাচাই করা যায়।
- খতিয়ানে একাধিক মালিক রয়েছে কিনা সেটি দেখতে হবে।
- খতিয়ানের হিস্যা অনুযায়ী উক্ত দাগ হতে আপনি জমি ক্রয় করতে পারবেন।
- বিক্রেতা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত হলে ওয়ারিশান সনদের সাথে মিল রেখে জমির হিসাব করতে হবে।
- জরিপ চলমান থাকলে বিক্রেতার কাছে থাকা মাঠ পর্চা যাচাই করে দেখতে হবে।

দলিল ও রেকর্ড যাচাই (Deed Verification)
অনেকসময় দেখা যায় জমি রেজিসট্রেশন করার পর নামজারি না করার কারণে মূল খতিয়ানে জমি থেকে যায় সে ক্ষেত্রে শুধু খতিয়ান দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয় যে উক্ত জমির মালিকানা হস্তান্তর হয়েছে কিনা। তাই আপনাকে সরেজমিনে জমিতে যেয়ে এবং সাব রেজিসট্রি অফিসে খোজ নিতে হবে।
- আপনাকে দেখতে হবে দলিলটি রেজিস্ট্রার অফিসে বৈধভাবে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে কিনা।
- বিক্রেতার কাছ থেকে সংগৃহীত দলিল সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যাচাই করেতে হবে।
- দলিলে উল্লিখিত তফসিল অনুসারে জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর, মৌজা ও মালিকের নাম সঠিক আছে কিনা।
- মালিকানার ধারাবাহিকতা সঠিক আছে কিনা অর্থাৎ পূর্বের দলিল চেইন (Chain of Ownership) দেখে মালিকানা ট্রান্সফার সঠিকভাবে হয়েছে কিনা।
- বিক্রেতা যদি ক্রয়সূত্রে ভূমির মালিক হয়ে থাকে তাহলে রেকর্ডের সঙ্গে মিল রেখে ধারাবাহিক মিল রয়েছে কিনা সেটি ভালভাবে দেখতে হবে। উক্ত বায়া দলিলে কোন হস্তান্তরকারী তার প্রাপ্য অংশের চেয়ে বেশি জমি হস্তান্তর করেছে কিনা সেটি দেখতে হবে।

জমির দাগ, মৌজা ও পরিমাপ যাচাই
জমির তফসিল সঠিক কিনা এটি অবশ্যই দেখতে হবে । মৌজা,দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ, দলিলে উল্লেখিত হাত নাকশা ইত্যাদি দলিল ও খতিয়ানের সঙ্গে মিলে কিনা তা মাঠ পর্যায়ে যাচাই করতে হবে।
প্রয়োজনে একজন সার্ভেয়ার দিয়ে জমি পরিমাপ করে নিতে হবে।
জমির শ্রেণি (Land Type) যাচাই
জমির শ্রেণী অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ কেননা কিছু কিছু জমির শ্রেণী রয়েছে সেগুলো বিক্রয় যোগ্য নয়। উদাহরণস্বরুপ যদি জমির শ্রেণী নদী, ডহর ইত্যাদি থাকে সেগুলো কেউ বিক্রয় করতে পারবে না। তাই বিক্রয় যোগ্য শ্রেণী যেমন জমিটি বাড়ি, পুকুর, ভিটা ইত্যাদি কোন শ্রেণির তা খতিয়ানে দেখে নিতে হবে।
রাস্তাঘাট ও অবস্থান মূল্যায়ন
জমির অবস্থান, রাস্তার প্রবেশাধিকার (Access Road), ও আশেপাশের অবকাঠামো পরীক্ষা করতে হবে। অনেকসময় রাস্তার পাশে হলে রোডস এন্ড হাইওয়ের একোয়ার করা জমি থাকে সেগুলোর মধ্য়ে আপনার জমি পড়েছে কিনা যাচাই করুন। এ বিষয়ে ভূমি অফিস অথবা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এস এ শাখায় তথ্য পাবেন।
জমির উপর কোনো মামলা বা বন্ধক আছে কিনা
জমিটি কোনো বিচারাধীন মামলা, ব্যাংক লোন, বা বন্ধক আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে। ইউনিয়ন ভূমি অফিস,আদালত ও ব্যাংক থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে।
পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সম্ভাবনা
আশেপাশের এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা, রাস্তাঘাট, মার্কেট, স্কুল, হাসপাতাল ইত্যাদি দেখে জমির ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করতে হবে। সরকারি কোন প্রকল্প বা জমি অধিগ্রহণের আওতায় কিনা তা যাচাই করুন।
সংক্ষিপ্ত চেকলিস্ট (Checklist Before Buying Land):
|
বিষয় |
যাচাই করার জায়গা |
|
খতিয়ান (CS, SA, RS, BS) |
ইউনিয়ন ভূমি অফিস / অনলাইন |
|
দলিল ও মালিকানা |
সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস |
|
নামজারি (Mutation) |
AC Land অফিস/ ইউনিয়ন ভূমি অফিস |
|
জমির দাগ, মৌজা, পরিমাপ |
ইউনিয়ন/পৌর ভূমি অফিস |
|
মামলা বা বন্ধক আছে কিনা |
ইউনিয়ন ভূমি অফিস/আদালত / ব্যাংক |
|
জমির শ্রেণি ও অবস্থান |
সর্বশেষ খতিয়ান / মাঠ পর্যায়ে যাচাই |
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঃ
দাখিলা যাচইঃ
বায়না যাচাইঃ
প্রস্তাবিত জমিটি অন্য কারো কাছে বায়না হয়েছে কিনা তা যাচাই করতে হবে। অন্যর সাথে বায়নাকৃত জমি ক্রয় করা যাবেনা।
খাস যাচাইঃ
অনেক সময় খতিয়ান নম্বর টেম্পারিনং করে। আপনি যে জমিটি ক্রয় করবেন সেটি ১ নং খাস খতিয়ানে কিনা সেটি যাচাই করে নিতে হবে।
উপসংহার:
জমি ক্রয় জীবনের একটি বড় বিনিয়োগ কেননা অনেকেই তার সারজীবনের উপার্জিত অর্থ দিয়ে জমি ক্রয় করে। তাই কাগজপত্র ভালভাবে যাচাই করে নিষ্কণ্ঠক জমি ক্রয় করুন।